একজন ফ্রিল্যান্সারের উঠে আসার গল্প

একজন ফ্রিল্যান্সারের উঠে আসার গল্প
Spread the love

মানুষ পারে না এমন কোনো অসাধ্য কাজ নেই। তাই গুণীজনরা বলেন ” মানুষ তাঁর স্বপ্নের সমান বড় “। তবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবানের পথ কখনো মসৃণ হয়না। এমন একজন সফল স্বপ্নের মালিক সুলেমান আহমদ। পেশায় একজন ফ্রিল্যান্সার। এই মূহুর্তে Upwork এর একজন Top Rared ফ্রিল্যান্সার। তবে তার উঠে আসাটা এতটা সহজ ছিলনা। পথে পথে সমস্যাকে সমাধানে রুপ দিয়ে আজ এতটুকু আসা।

একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন। ছোটবেলা ভালোই কেটেছে। উনার বাবার আয়ের উৎস হিসেবে চাষের জমি ছিল কিছু। চাচা একজন ছিলেন UK তে। উনার বাবাও ছিলেন সেখানে কিছুদিন। কিন্তু ভাগ্য সহায় না হওয়াতে তিনি ফিরে আসেন দেশে। সব মিলিয়ে দিন যাচ্ছিল ভালোই। তখন হয়ত বুঝিনি যে সামনে একটা হিমালয় সমান কষ্টের পাহাড় দাঁড়িয়ে রয়েছে।

UK তে যে চাচা ছিলেন উনার সাথে বাবার শ সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই ভালো ছিলনা। কিন্তু উনার বাবা ওই চাচাকে খুব ভালোবাসতেন। সেই ভালোবাসাই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের জীবনে। সেই ভালোবাসার একটা ফায়দা নিয়ে নেন উনার UK প্রবাসী চাচা। উনার সহজ সরল বাবাকে বুঝিয়ে সব সহায়-সম্পত্তি লিখেন নেন UK প্রবাসী চাচা।

ওই যে রূপক অর্থে একটা কথা আছে যে ‘ এক তরফা ভালোবাসা মানুষকে শুধু কাঁদায়।’ সেই কান্না করেছিলেন উনার বাবা। যন্ত্রণাটা এতটাই লেগেছিল যে হৃদ্স্পন্দনও কাজ করছিলনা। যন্ত্রণাটা সহ্য না করতে পেরে সাথে সাথে ষ্ট্রোক করেন ফেলেন। একটা কথা বিধাতা কখনো মুখ ফিরিয়ে নেন না। তবে আশেপাশের মানুষ বসন্তের কোকিলের মত মুখ ফিরিয়ে নেয়। উনাদের সাথেও তেমনটা হয়েছিল।

বাবার জমানো সব টাকা চিকিৎসা বাবদ খরচ হয়ে যায়। সেই সময় ২০১৫ সাল সামনে আর ৩ মাস বাকী H.S.C পরীক্ষা। একদিকে পরীক্ষা অন্যদিকে অসুস্থ বাবা। চোখে পথ না দেখার অবস্থা। একে পরিবারের বড় ছেলে অন্যদিকে অসুস্থ বাবা। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখছিলেন। তবে উনি হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না কখনো। ওই যে একটা কথা আছে না ‘ কষ্ট নামক যন্ত্রণার পরেই যে আসে সুখ। মনে মনে ভালো কিছু একটা করার দৃড় প্রত্যয় ছিল উনার। আর তখনি মাথায় ঢুকে ফ্রিল্যান্সিং এর পোকো।

যেভাবে শুরু করলেন ফ্রিল্যান্সিং।

ফ্রিল্যান্সিং নামক যুদ্বে যখন নামলেন ঢাল-তালোওয়ার হিসেবে তখন ছিল পেন্টিয়াম-৪ মডেলের একটি কম্পিউটার, যেটা গেম খেলার জন্য বাবা কিনে দিয়েছিলেন। তবে সে সময় থেকে কম্পিউটারে গেম খেলার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে ঘাটাঘাটি করতেন। ইচ্ছা ছিল গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখার। বিভিন্ন মাধ্যম ঘেঁটে গ্রাফিক্স ডিজাইনের বেসিকটা আয়ত্ব করে নিয়েছিলেন। তবে সেখানে বেশি দিন টিকে থাকতে পারলেন না। কারণ খুব তাড়াতাড়ি আয় করা যে শিখতে হবে। পুরো একটা পরিবার ছিল উনার দিকে তাকিয়ে।

সেই সময় ‘ Virtual Edge এর শুভ স্যার ‘ উনাকে ৭ দিনের একটা ট্রেনিং দেন লিড জেনারেশন এর উপর একটা সংক্ষিপ্ত কোর্স করিয়ে কাজে লাগিয়ে দেন। কোনো কিছু না ভেবেই তিনিও শুরু করে দেন লিড জেনারেশনের কাজ। সেখান থেকে খুব একটা আয় হত না। শুধু নিজের চলাফেরা করার টাকা আসত। তারপরও চালিয়ে গেছেন কাজ। ৯টা হতে ৬টা হতে অফিসে কাজ, আসার সময় আরো কাজ নিয়ে আসতেন রাত করতেন। এক কথায় মানুষরূপী একটা রোবটে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন সে সময়। দিনে ২৪ ঘন্টায় মধ্যে ৩-৪ ঘন্টা চোখকে অবসর দিতেন।

কেউ ছিলনা তখন পথ দেখানোর। নিজে নিজে রিসার্চ করেতে করতে Upwork নিয়ে ধারণা নিতে শুরু করলেন। কিন্তু সেখানেও বিধিভাম। Upwork নিয়ে পড়ে থাকায় কমতে থাকে উনার কাজের পরিণাম। কমতে থাকে আয়। খাওয়া-দাওয়া, মেস ভাড়া দেওয়া হয়ে পড়ে তখন অসাধ্য। তখনি এগিয়ে আসেন উনার বন্ধু ইমাদ।

সব মানুষের সফল হওয়ার পেছনে কিছু কিছু মানুষের অবদান থাকে। উনার জীবনে ইমাদ তেমনি একজন। বন্ধু ইমাদ উনাকে তার বাসায় থাকা – খাওয়ার সুযোগ করে দেয়। প্রথমে খারাপ লাগছিল তবে কোনো উপায় ছিলনা উনার। চলে আসলেন বন্ধু ইমাদের বাসায়। পাশে পেয়িছিলেন মা ও গ্রামের গুটি কয়েক মানুষকে। গ্রামের সবাই হাসাহাসি করত খুব। তবে উনি থেমে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না।

সব চিন্তা ভাবনা করে ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে নিজের স্বপ্নের প্ল্যাটফর্ম Upwork এ খুলে ফেললেন অ্যাকাউন্ট। অনেক কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে Account approve করালেন Upwork এ। সেই সাথে শুরু আরেক যুদ্ধ। নিজেকে প্রমাণের যুদ্ধ। সেখানে কাজ পাওয়া এতটা কঠিন হবে বুঝতে পারছিলেন না। ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তবে দমে থাকেন নি।

অবশেষে ২ মাস ২০ দিন পর ভাগ্য বিধাতা মুখ তুলে চাইলেন। প্রতি ঘন্টায় $৫ ডলারের সপ্তাহে ৫ ঘন্টার একটি কাজ পেয়েছিলেন। উনার জীবনের অন্যতম খুশির দিন ছিল ওই কাজ পাওয়ার দিনটি। তবে সেখানে ভাগ্য সহায় হলনা। খুশিটা বেশি দিন থাকেনি। নিমিষেই হারিয়ে যায় খুশি। দেড় মাস পড় কোনো প্রকার কারণ ছাড়াই ক্লায়েন্ট কাজটি বন্ধ করে দেয় ১* ফিডবেক দিয়ে। কোনো রকম উপায় না পেয়ে আইডিতে যাতে কোনো সমস্যা না হয় সে জন্য পুরো কাজের টাকা Refund করে দেন। হতাশ হয়েছিলেন তখন প্রচুর। তবে মন থকে সৎভাবে কোনো কিছু চাইলে সৃষ্টিকর্তা কখনো ফিরিয়ে দেন না।

কারণ ‘ঘনকালো মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝড়ার পরই কিন্তু দীপ্তমান আলোর দেখা মেলে। ওই সপ্তাহেই আরো একটি কাজ পেয়ে যান উনি। আজ পর্যন্ত যা পেয়েই যাচ্ছেন। Upwork এ এখন Top Rated ফ্রিল্যান্সার উনি।

শুধু কি তাই, উনি স্বপ্ন দেখতে বড় পরিসরে কিছু করার। উনি যেমন কিছু শিখতে পারছেন তেমনি আরো কিছু ছেলে-মেয়ে যাতে জীবনে কিছু একটা নিজে করতে পারে সেই স্বপ্ন লালন করেছিলেন বহুদিন। সেই স্বপ্নের সারথী হয়ে উনার খুব কাছের আরেকজন বড় মাপের ফ্রিল্যান্সার তোফায়েল আহমদ দুজন মিলে গড়ে তুলেছেন GROWNOB নামে একটি এজেন্সি। যেখানে প্রায় ৪০ – ৫০ জন টিম মেম্বার নিয়ে চলতেছে কাজ। উনার চাওয়া বেকারত্বের অভিশাপে যেন কেই দুকড়ে না থাকুক। উনার জায়গা থেকে সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর।

পুরো পরিবার নিয়ে সিলেট শহরে থাকেন বাসায়। অনেক স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তবে পূর্ণতার মাঝে রয়ে যায় কিছু অপূর্ণতা। উনার ইচ্ছা ছিল খুব নিজের বাবাকে নিয়ে পবিত্র হজ পালন করার। সব ব্যবস্থাও করেছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালে রমজানে সবাই ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান উনার স্নেহধন্য বাবা। সেখানে বসেই ছেলের সফলতা দেখতেছেন উনি।

তাই বলি জীবনে হারার আগে হারতে নেই। কেই পরিপূর্ণ না, নিজের কাজের মধ্যে দিয়েই সফলতা আর পরিপূর্ণতা অর্জন করে নিতে হয়।

একটা কথা বলে রাখি, ওনার সাথে কথা বলার সময় একটিবার সফল যে উনি পুরোপুরি এটা দাবি করেন নাই। ওনার কথা হল সফলতা তখনি দাবি করব, যখন আরো কিছু ছেলে-মেয়েকে নিজের হাতে এই ফ্রিল্যান্সিং জগতে তুলে আনতে পারব। বিশ্বের এই ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে নিজের সাথে নিজের দেশের নাম আরো উপরে তুলে ধরতে পারব, সফলতার ট্যাগ তখনি লাগব।

বি:দ্র: লেখাটি যারা এই ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারে নতুন তাদের একটু হলেও যেন হতাশে দূর করে কাজের প্রতি মনোনিবেশ হয় এই উদ্দেশ্যই।

admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *