নিউজবাংলা: শনিবার, ২৭ জুন:
ঢাকা: পহেলা জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল কার্যকর হলেও সারাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা তা না-ও পেতে পারেন। এ জন্য তাদের আরও ৬ মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়,

এ সময়ের মধ্যে এমপিওভুক্ত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন করা হবে। বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মান্থলি পে-অর্ডার বা এমপিও দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা অসঙ্গতি ও অনিয়ম রয়েছে। তা দূর করতে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো পর্যালোচনা করা হবে। এ জন্য এ বিষয়ে একটি নীতিমালা করা হচ্ছে। তা চূড়ান্ত করার পরই পে স্কেল কার্যকর হবে শিক্ষকদের। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও সুবিধা পাচ্ছেন। নতুন বেতন স্কেলের আশায় তারা চাতক পাখির মতো প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন। জুলাই থেকে বর্ধিত বেতন না পেলে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা ঈদের পর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রতিবেদন সমকাল।
জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কবে থেকে ‘বর্ধিত বেতন’ পাবেন তা সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা তাদের কাছে আসেনি। শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘শিক্ষকরা নতুন পে স্কেল পাবেন না, এমন কোনো খবর আমার কাছে নেই। পাবেন বলেই জানি।’ তাহলে কি বলা যাবে জুলাই থেকেই তারা নতুন স্কেলে বেতন পাচ্ছেন?
এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘আমরা তাই-ই জানি।’ তবে শিক্ষা সচিব এ কথা বললেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, এ ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে তোলা হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে সেখানেই।
সূত্র জানায়, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে ‘সচিব কমিটি’ যে সুপারিশ করেছে, তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের বিষয়টিও আলোচনা করা হবে। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের
আলোকেই শিক্ষকদের জন্য নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা হবে। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময় মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের জন্য উঠতে পারে।
জানা গেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন পে স্কেলের বিষয়ে আজ শনিবার জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আজ তিনি এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে সংসদকে সুস্পষ্ট কিছু জানাতে পারেন। ৪ জুন নতুন অর্থবছরের (২০১৫-১৬) বাজেট ঘোষণাকালে অর্থমন্ত্রী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল কার্যকরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তবে বেসরকারি শিক্ষকদের সম্পর্কে তখন কিছু বলা হয়নি। পরের দিন বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান অর্থমন্ত্রী।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সরকারি চাকরিজীবীদের পে স্কেল কার্যকরের ৬ মাস পর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কার্যকরের সুপারিশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত পে কমিশন। গত বছরের ডিসেম্বরে অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। এর পর পে কমিশনের মূল প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞার নেতৃত্বে গঠন করা হয় ‘সচিব কমিটি’।
গত এপ্রিলে জমা দেওয়া এই কমিটি ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের মতোই এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ‘বর্ধিত বেতন’ ছয় মাস পর কার্যকরের সুপারিশ করে। এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, শিক্ষকদের ‘বর্ধিত বেতন’ কার্যকরের বিষয়ে সরকার এখনও তার আগের অবস্থানেই রয়েছে।
নীতিমালা হচ্ছে:
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এমপিওভুক্তির জন্য একটি যুগোপযোগী ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। ওই নীতিমালা প্রণীত হলে তার আলোকে এমপিওভুক্তির কার্যক্রম যৌক্তিকভাবে ঢেলে সাজানো হবে। এরপরই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল কার্যকর করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এরই মধ্যে এমপিওভুক্তির নতুন নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। এ খসড়ার ওপর বর্তমানে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হচ্ছে। নীতিমালার নানা শর্ত নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। খসড়া নীতিমালাটি তৈরি করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন জানান, গত বছরের ৩১ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে এমপিও প্রদানের ব্যাপারে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নির্দেশনা অনুযায়ী এমপিও নীতিমালায় সংশোধনী আনা হচ্ছে। জানা গেছে, এমপিও নীতিমালা সংশোধন করতে গত ২১ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাউশিকে চিঠি পাঠানো হয়। এরপর ২৫ জানুয়ারি মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক ড. এসএম ওয়াহিদুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। গত বৃহস্পতিবার জানতে চাইলে ড. এসএম ওয়াহিদুজ্জামান জানান, এ নীতিমালাটি এখন চূড়ান্ত প্রায়।
বাড়তি কত টাকা লাগবে:
শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন স্কেলে বর্ধিত বেতন দিতে গেলে ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত লাগবে। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে যে পরিমাণ টাকা লাগে, এটি হবে তার চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। বর্তমানে সারাদেশের ২৬ হাজার ৭০টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৪ লাখ ৭৭ হাজার ২২১ শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত রয়েছেন। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে এমপিওভুক্তি খাতে সরকারের বরাদ্দ ছিল ৭ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে, এ বরাদ্দের পুরোটাই খরচ হয়ে যাচ্ছে। সংশোধিত বাজেটে বাড়তি আরও কিছু টাকা প্রয়োজন হয়েছে।
শিক্ষক সংগঠনগুলোর বক্তব্য:
এ নিয়ে সরকার সমর্থক সংগঠন জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্টের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আসাদুল হক বলেন, ‘জাতীয় নতুন বেতন স্কেলে এর আগেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এবারও হবেন বলেই তাদের বিশ্বাস।’ পে কমিশন ও সচিব কমিটির সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে এ শিক্ষক নেতা আরও বলেন, ‘শিক্ষকদেরও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো ১ জুলাই থেকে নতুন স্কেলের সুবিধা দিতে হবে।’ তিনি জানান, তারা শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
সরকার সমর্থক অপর শিক্ষক সংগঠন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী সাজু বলেন, ‘শেখ হাসিনার আমলে ১৯৯৯ সালে বেসরকারি শিক্ষকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। এবার ভিন্ন সিদ্ধান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
আন্দোলনের প্রস্তুতি:
এদিকে বেতন স্কেল ইস্যুতে ঈদের পর আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। সরকার সমর্থক ও বিরোধী উভয় শিক্ষক সংগঠনগুলো এক হয়ে এই আন্দোলনে নামছে।

নিউজবাংলা/একে